দৌলতপুর মুহসিন মহিলা কলেজে অস্থিরতার ১৯ মাস

পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি পরিবর্তন চারবার, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দু’জন, ১৪ শিক্ষককে শোকজ

একরামুল হেসেন লিপু

দৌলতপুর মুহসিন মহিলা কলেজের অস্থিরতা কাটছে না। গত বছরের ১৩ জুন উপাধ্যক্ষসহ সাত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগকে কেন্দ্র করে অস্থিরতার সূত্রপাত। ১৯ মাসে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি পরিবর্তন হয়েছে চারবার।

জানা গেছে, অবসরে যাওয়ার পূর্বে তৎকালীন অধ্যক্ষ মোঃ আব্দুল লতিফ জৈষ্ঠ শিক্ষক নওরোজী কবিরকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং তৎকালীন জিবি’র সভাপতি শেখ কামরুজ্জামান একই পদে মোঃ মাহফুজার রহমানকে দায়িত্ব দেন। শুরু থেকে নওরোজী কবির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের চেয়ার দখলে রেখেছেন। মাহফুজার রহমানও বসে নেই। চেয়ারথদখলের অনবরত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ঘটনায় শিক্ষকরাও বিভক্ত হয়ে পড়েছেন দু’গ্রুপে। এতে ব্যাহত হচ্ছে কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম। গত ২৭ আগস্ট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি শেখ কামরুজ্জামানকে পরিবর্তন করে সভাপতি হিসেবে পরিচালনা পর্ষদের পূর্বের কমিটির বিদ্যোৎসাহী সদস্য মোঃ মোক্তার হোসেনকে সভাপতি হিসেবে মনোনয়ন দেয়। সভাপতি শেখ কামরুজ্জামান ২৮ জুন সর্বশেষ পরিচালনা পর্ষদের মুলতবি সভাকে পূর্ণাঙ্গ সভায় রূপান্তরিত করে ১৪ শিক্ষকের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কিছু সিদ্ধান্ত নেন। যেটা পরিচালনা পর্ষদের নিয়মিত খাতায় রেজুলেশন না করে ভিন্ন খাতায় রেজুলেশন করেন। ওই সভার সিদ্ধান্তের রেজুলেশন বিধিসম্মত হয়নি অভিযোগ এনে বাতিল করেন নতুন সভাপতি মোঃ মোক্তার হোসেনের নেতৃত্বে ১২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের প্রথম সভায়। সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা নওরোজী কবির ১৪ সেপ্টেম্বর, ২৮ জুনের মুলতবি সভার রেজুলেশনের সুবিধাভোগী ১৪ শিক্ষককে কারণ দর্শানো নোটিশ দেন। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর শিক্ষকদের মধ্যে অস্থিরতা আরো বেড়ে যায়।

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নওরোজী কবির স্বাক্ষরিত নোটিশে বিধি বহির্ভূতভাবে ওই রেজুলেশনের সুবিধাভোগী ১৪ শিক্ষককে ভিন্ন ভিন্নথকারণ উল্লেখপূর্বক প্রত্যেককে পৃথকভাবে শোকজ নোটিশ দেন।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, চব্বিশের ৫ আগস্টের পর ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি কেসিসি’র সাবেক কাউন্সিলর শেখ কামরুজ্জামান ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হন। ১৩ জুন উপাধ্যক্ষসহ সাত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগকে কেন্দ্র করেথজাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ১৪ অক্টোবর প্রফেসর মোঃ ইকবাল হোসেনকে সভাপতি হিসেবে মনোনয়ন দেয়। ওই মনোনয়নের বিরুদ্ধে শেখ কামরুজ্জামান হাইকোর্টের রিট করেন। রিটের স্থগিতাদেশ নিয়ে চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনিথপুনরায় সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পূর্বের অভিযোগের সূত্র ধরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ২৭ আগস্ট মোঃ মোক্তার হোসেনকে সভাপতি হিসেবে মনোনীত করে।

মোঃ মোক্তার হোসেন সভাপতি মনোনীত হওয়ার পর ১২ সেপ্টেম্বর পরিচালনা পর্ষদের সভায় ২৮ জুনের সভার রেজুলেশন বাতিল করেন।

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নওরোজী কবির খুলনা গেজেটকে বলেন, “জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোনীত সভাপতি মোঃ মোক্তার হোসেনের সভাপতিত্বে ১২ সেপ্টেম্বর পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় ২৮ জুন তারিখের মুলতবি সভা নিয়ে একটা এজেন্ডা ছিল। ১২ সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত সভায় ২৮ জুনের সভার সবাই উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত সদস্যরা বলেছেন মিটিং মুলতবি হয়ে যায়। এমনকি সদস্য সচিব যিনি ছিলেন জগলুল আলম তিনিও বলেছেন পরবর্তীতে কীভাবে এ রেজুলেশন লেখা হয় আমি কিছুই জানি না। ১২ সেপ্টেম্বর মিটিংয়ে ২৮ জুন তারিখের রেজুলেশন বাতিলের সিদ্ধান্ত হয় এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগী সকল ব্যক্তিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে আমাকে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়।”

এ প্রসঙ্গে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দাবিদার মোঃ মাহফুজার রহমান বলেন, ২৮ জুনের মিটিং কে মুলতবি করেছে? মিটিং মুলতবি হলে সেই মিটিংয়ের রেজুলেশন কি করে হয়? আগে থেকে এজেন্ডা দিয়ে সভাপতি নিজেই মিটিং ডেকেছেন। সবাইকে চিঠি দিয়ে দাওয়াত করেছেন এক সপ্তাহ আগে থেকে। আমার জানা মতে, সময়মতো মিটিং চলছিল, মিটিংয়ের মাঝখানে কিছু হট্টগোল হলে মিটিং থেমে যায়। পরবর্তীতে আবার শুরু হয়। মিটিংয়ে শিক্ষকদের বকেয়া পাওনা, দাবি-দাওয়া সংক্রান্ত ব্যাপারে সবাই একমত হয়। রেজুলেশনে ৮ জন সদস্যের স্বাক্ষর আছে।

তিনি বলেন, কলেজের উপাধ্যক্ষ এবং ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আমি। জিবি মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সভাপতি আমাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। নিয়ম অনুসারে এ সংক্রান্ত কপি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যাচাই-বাছাই করে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয় আমি বৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ।

পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মোঃ মোক্তার হোসেন বলেন, যে রেজুলেশন দিয়ে পূর্বে সভাপতি কার্যক্রম চালিয়েছেন সেটা সম্পূর্ণ অবৈধ। আমি নিজেও ওই মিটিংয়ের সদস্য ছিলাম। মিটিং মুলতবি করে আমরা সবাই চলে যায়। পরবর্তীতে সাবেক সভাপতি বাড়ি বসে কলেজের রেজুলেশনের রেগুলার খাতা বাদ দিয়ে অন্য খাতায় তৈরি করেন। সভাপতি হিসেবে প্রথম মিটিংয়ে উপস্থিত সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে সর্বসম্মতিক্রমে পূর্বের রেজুলেশনের সিদ্ধান্ত বাতিল বলে গৃহীত হয়। ওই রেজুলেশনের সুবিধা নিতে ১৪ জন শিক্ষক বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করেন। যে কারণে তাদেরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদানের জন্য ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়।

সাবেক সভাপতি শেখ কামরুজ্জামান বলেন, দায়িত্ব থাকাকালীন কলেজে কোনোদিন কোন অনিয়মের কাজ করিনি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমার কাছে সব রেজুলেশন খাতা আছে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন